A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

ফিরে দেখা টানবাজার সেই যৌনপল্লী এখন সুতার জমজমাট মোকাম | Probe News

ফিরে দেখা টানবাজার

সেই যৌনপল্লী এখন সুতার জমজমাট মোকাম

শফিক রহমান, প্রোবনিউজ: নারায়ণগঞ্জের এক সময়ের আলোচিত পতিতা পল্লী ‘টানবাজার’ এখন সুতা ব্যবসায়ীদের বৃহত্তম মোকাম। এখানকার প্রতিটি ভবনে যেখানে ছিল যৌনকর্মীদের বসবাস। সেখানে এখন বসেছে ছোট এবং মাঝারি আকারের সুতার কারখানা, অফিস। দিন ও রাতের বেশিরভাগ সময়ই পল্লীজুড়ে ব্যস্ততা শ্রমিক, মালিক আর ব্যবসায়ীদের আনাগোনায়। তারপরও আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে পতিতা পল্লীর প্রসঙ্গ। স্থানীয়দের অনেকেরই দাবি, পতিতা পল্লী উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত সামাজিক এবং ধর্মীয় বলা হলেও আসলে তা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের একক সিদ্ধান্তে উচ্ছেদ করা হয় প্রায় ১১০ বছরের পুরনো এই পতিতা পল্লীটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পল্লীটি উচ্ছেদ ইস্যুতে নির্বিকার ছিলেন সদর আসনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য এস এম আকরাম। আজ ২০১৫ সাল। উচ্ছেদের প্রায় ১৬ বছরের মাথায় এসেও খুন, গুম আর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শামিম ওসমান এবং তার পরিবার। শামীম ওসমানের বড় ভাই সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর ওই আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ওসমান পরিবারের অপর সদস্য সেলিম ওসমান।

যেহেতু একসময় টানবাজার বলতেই মানুষজন পতিতা পল্লীকে বুঝতো, সেই কালিমা ঘোচাতে এখন এলাকার নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। উত্তর-দক্ষিণমুখী ছোট সরু গলি পথের দুই প্রান্তে বসানো হয়েছে সাইন বোর্ড। নতুন নামকরণ হয়েছে ‘মোহাম্মদ কমপ্লেক্স, কুটিপাড়া, টানবাজার, নারায়ণগঞ্জ’।

এছাড়া পতিতা পল্লীর টিন শেড ঘরগুলোর জায়গায় উঠেছে পাকা ভবন। একতলা, দুইতলা ভবনের ওপরে যোগ হয়েছে আরো তিনতলা, চারতলা। আর যৌনকর্মীদের বসবাসের ছোট্ট কামরাগুলো ভেঙ্গে বড় পরিসরে বসানো হয়েছে সুতার কুনিং, রেলিং এবং টুইস্টারের কারখানা। পল্লীর ১৪টি ভবনের মধ্যে দুইটি ছিল একতলা টিনশেড ভবন। পতিতাপল্লী উচ্ছেদের সময় এখানে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার যৌনকর্মী ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বর্তমানের মোহাম্মদ কমপ্লেক্স এলাকার একটি ভবনের নীচতলায় সুতার কারখানা বসিয়েছেন শরিয়তপুরের মো. দেলোয়ার (২০)। চারবছর আগে এমনি একটি সুতার কারখানায় চাকরি করেছেন তিনি। তিনলাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে প্রায় বছরখানেক আগে নিজেই বসিয়েছেন কারখানা। রফতানিমুখী গার্মেন্টের ওয়েস্টেজ সুতা ঝুট হিসেবে কিনে এনে নিজের কারাখানায় কুনিং করে স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। এলাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে অনেকটা লাজুক মুখে দেলোয়ার বললেন, ‘শুনেছি এখানে এক সময়ে খারাপ কাজ হতো’।

শুধু দেলোয়ারই নয়। টানবাজার নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন শ্রমিক, মালিক আর ব্যবসায়ীদের অনেকেরই। সরু গলি পথের উত্তর প্রান্তের গেটে ছোট চায়ের দোকান। দোকান পার হয়ে সামনে এগুলেই গলির দুই পাশে রাহা এন্টারপ্রাইজ, আলমগীর এন্টাপ্রাইজ, ঝুমু এন্টারপ্রাইজ, সাঈদ এন্টারপ্রাইজ, জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজ, ইরশাদ এন্টারপ্রাইজ বা আরপি ট্রেডার্সসহ নানা প্রতিষ্ঠানের নামে গদিঘর বা অফিস। এদের অনেকেই ভাড়াটিয়া হলেও পৈত্রিক মালিকানাধীন ভবনের নীচ তলায় কারখানা এবং অফিস করেছেন কামরুল হাসান জুয়েল। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ইরশাদ এন্টারপ্রাইজ।

কামরুল হাসান জুয়েল জানান, যৌনকর্মীদের উচ্ছেদের পরও বছরের পর বছর পতিতা পল্লীর দুটো গেটেই পুলিশী পাহারা ছিল । ভেতরে ঢুকতে পারেননি ভবনের মালিকরাও। প্রায় চারবছরের মাথায় এসে ভবনগুলোতে কোন ধরনের আবাসিক হোটেল এবং বিউটি পার্লার করা হবে না, প্রশাসনের কাছে এমন মুচলেকা দিয়ে ভবনের দখল বুঝে পান তারা।
এর পরে ধীরে ধীরে সাবেক এই পল্লীতে জমে উঠছে সুতার ব্যবসা। জমজমাট ব্যবসায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে কামরুল হাসান জুয়েল বললেন, ‘শুকরিয়া, ভালোই আছি’।

পতিতা পল্লীতে ভবন, যৌনকর্মীদের কাছে তা ভাড়া দেয়া এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে সামাজিক অবস্থান ও মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে কামরুল হাসান জুয়েল বলেন, ‘অন্য বাড়িওয়ালাদের খবর জানি না। তবে বাবা আমাদেরকে জানতে দেননি কোথায় আমাদের বাড়ি আছে। বাবা আমাদেরকে ঢাকা মগবাজার এলাকায় বাসা ভাড়া করে রেখেছেন। হাবিবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়াশুনা করেছি। বড় হয়ে যখন বাড়িটির অবস্থান জানতে পারলাম ততক্ষণে উচ্ছেদ হয়ে গেছে যৌনপল্লী’।

তিনি আরো বলেন, তাছাড়া বাবাও কোন দিন এখানে ভাড়া তুলতে আসেননি। ম্যানেজার ছিলেন তিনিই সবকিছু করতেন। বাধ্য হয়েই বাবাকে সেই ভাড়াটা নিতে হতো। কারণ, ওখানে যৌনকর্মীদের কাছে ভাড়া দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। একই সঙ্গে কামরুল হাসান জুয়েলের বক্তব্য, যৌন পল্লী থাকা খারাপ কিছু দেখছি না। যৌনতাকে যারা ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারা বৈধতার সঙ্গেই সেই কাজটি করেছেন। আবার তারা এবাদত করতেন তারও প্রমাণ আছে। উচ্ছেদের পরে যেদিন প্রথম এই ভবনে ঢুকি সেদিন যৌনকর্মীদের রুমে কোরআন, তজবি এবং জায়নামাজও পেয়েছি। শুনেছি তারা নাকি রোজাও রাখতেন। অথচ, আমাদের সমাজের কথিত ভদ্র সমাজের লোকেরা সেই যৌনকর্মীদের সোনা, গহনা, অলঙ্কার, টাকাসহ সবকিছুই লুুটপাট করেছে উচ্ছেদের পরে। এমনকি ভবনের দরজা আর জানালর গ্রিল পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে তারা।

জুয়েলের বাবা ছিলেন মো. জুলহাস। জানা গেছে এছাড়াও ওই এলাকায় ভবনের মালিকানা ছিল দৌলত খান, ফিরোজ মিয়া, মাইনুদ্দিন, মনির খান, সলিমুল্লাহ এবং আনোয়ার হোসেনসহ আরো কয়েকজনের। এদের মধ্যে অনেক আগেই মারা গেছেন মো. জুলহাস, দৌলত খান, ফিরোজ মিয়া, সলিমুল্লাহ এবং আনোয়ার হোসেন।

দৌলত খানের বোন জামাই ছিলেন আনোয়ার হোসেন। পরবর্তী সময়ে দৌলত খানের ছেলে জাকির খান এবং আনোয়ার হোসেনের ছেলে বদিউজ্জামান বদু নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এর মধ্যেই আনোয়ার হোসেনের মেয়ের জামাই সোহেল খুন হন। পরিবার দুটির অভিযোগ ছিল সোহেলের খুনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ওসমান পরিবার। এর পরেই জাকির খান এবং বাদিউজ্জামান বদু সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিএনপি’র রাজনীতিতে। বিশেষ করে শামীম ওসামানের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে থাকেন জাকির খান। আর জাকির খানসহ ওই পরিবারটিকে সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে কোনঠাসা করতেই পতিতা পল্লীটি উচ্ছেদ করা হয়। এতোদিন পরেও এসব অভিযোগ করেন নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে পতিতা পল্লী উচ্ছেদের পর ঝিমিয়ে পড়েছে পুরো টানবাজার এলাকা। নেই জমজমাট ভাব, দেশী-বিদেশী লোকের আনা গোনা। এমন অভিযোগও করেন কেই কেই। তাদের ভাষ্যমতে, পল্লীর দক্ষিণ দিকের গেট থেকে বেরিয়ে একটু সামনে এগুলেই ছিল ‘হংস’ সিনেমা হল। বৃটিশ আমলে যার নাম ছিল হংস থিয়েটার। মূলত দেশি-বিদেশী ব্যবসায়ীদের মনোরঞ্জনের জন্যেই হলটি নির্মাণ করেছিলেন জনৈক সুকুমার পাল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে হলটি রূপ নেয় সিনেমা হলে। পতিতা পল্লী উচ্ছেদের পর ২০০২ সালে দিকে ভেঙ্গে ফেলা হয় হংস সিনেমা হল। সেখানে উঠেছে এখন বহুতল ভবন।

এছাড়া পল্লীর উত্তর দিকের গেট থেকে বেরিয়ে একটু সামনে এগুলেই একই কম্পাউন্ডে পাশাপাশি দুইটি সিনেমা হল। একটির নাম ‘আশা’ এবং অপরটির নাম ‘মাসার’। পতিতা পল্লী উচ্ছেদের পর বন্ধ হয়ে যায় মাসার সিনেমা হলটি। তবে এখনও চলছে আশা সিনেমা হলটি। জানা গেছে, সিনেমা হল দুটির মালিক ছিলেন জনৈক গোকুল পোদ্দার। পরে মালিকানায় পরিবর্তন হয়ে আসে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র সেলিনা হায়াত আইভির নানা মেহবুব হোসেন কিনে নেন। মেহবুব হোসেন গড়ে তোলেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আশা প্রোডাকশন’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে প্রযোজিত হয় একাধিক ব্যবসা সফল ছবি। সিনেমা হলের দেয়ালে ঝুলানো পুরনো একাধিক পোষ্টারে লেখা রয়েছে ‘বেগম আনোয়ারা মেহবুব নিবেদিত চলচ্চিত্র’ এই কথাটি।

স্থানীয়রা জানান, যৌন পল্লী উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় এখানকার একাধিক খাবারের হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট। এর মধ্যে পল্লীর উত্তর গেটে ছিল নোয়াখালী হোটেল এবং সামছু হাজীর হোটেল। দক্ষিণের গেটে ছিল সালমা হোটেল, মুন্সির হোটেল, সানোয়ারা হোটেল, ভাই ভাই হোটেল, আক্কাসিয়া হোটেল এবং হোটেল সুপার। এগুলোর মধ্যে কেবল ‘হোটেল সুপার’ লেখা সাইন বোর্ড সম্বলিত একটি টিনের দোতলা ঘর এখনও অবশিষ্ট রয়েছে । ঘরটির নীচতলায় একটি মুদি দোকন ও একটি চায়ের দোকান থাকলেও অস্থিত্ব নেই হোটেলের।

পল্লীর পাশ ঘেষেই ছিল নারায়ণগঞ্জের আদি ব্যবসা কেন্দ্র ‘টানবাজার পার্ক মার্কেট’। প্রায় দেড় শতাধিক শাড়ী ও থান কাপড়ের দোকান ছিল এখানে। ঝিমিয়ে পড়েছে সেই মার্কেটও। রাস্তার ওপর কয়েকটি দোকানে শাড়ি, লুঙ্গি, ফতুয়া পাঞ্জাবি, জুতা স্যান্ডেল বিক্রি হলেও বাকি সব দোকানে বসেছে সুতার কারখানা। কিছু কিছু দোকানে চলছে এমব্রয়ডায়রির কাজ।

১৮টি জুয়েলারি শপ নিয়ে গড়ে ওঠা মীনাবাজারের ব্যবসাও আর আগের মত নেই। যদিও এখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, পতিতা পল্লীর উচ্ছেদের কারণে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কারণেই তাদের মার্কেটেও ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে।

প্রোব//শর/পি/জাতীয়/০৭.০৯.২০১৫

৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ | জাতীয় | ১৫:৩৮:০৯ | ১৬:৫৮:২২

জাতীয়

 >  Last ›